Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   বৃষ্টিভেজা টাইমস স্কয়ারে শক্তি ডি গুপ্তার নীরব প্রতিবাদ, দুর্গোৎসবের আনন্দের মাঝে বাংলাদেশে নির্যাতিত সনাতনীদের মুক্তির আকুতি

বৃষ্টিভেজা টাইমস স্কয়ারে শক্তি ডি গুপ্তার নীরব প্রতিবাদ, দুর্গোৎসবের আনন্দের মাঝে বাংলাদেশে নির্যাতিত সনাতনীদের মুক্তির আকুতি

বৃষ্টিভেজা টাইমস স্কয়ারে শক্তি ডি গুপ্তার নীরব প্রতিবাদ, দুর্গোৎসবের আনন্দের মাঝে বাংলাদেশে নির্যাতিত সনাতনীদের মুক্তির আকুতি

উত্তম কুমার সাহা:

শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই আনন্দ, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ, দেবী দুর্গার আরাধনা আর প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলনমেলা। মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার কাছে মানুষের প্রার্থনা—অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, শুভ ও সত্যের জয় হোক, পৃথিবী থেকে দূর হোক অন্যায়, অবিচার ও অমানবিকতা। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দের মাঝেও যখন কোথাও মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আতঙ্কে দিন কাটায়, যখন কোনো পরিবারকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপত্তার সন্ধানে ছুটতে হয়, যখন কোনো ব্যক্তি বিচারপ্রক্রিয়া ও মামলার জটিলতায় বন্দিজীবন কাটান, তখন উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি বিবেকের দরজাতেও কড়া নাড়ে কিছু কঠিন প্রশ্ন।

২০২৬ সালের ১০ ও ১১ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের প্রাণকেন্দ্র ফাদার ডাফি স্কয়ারে, বিশ্বখ্যাত টাইমস স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব। টাইমস স্কয়ার দুর্গোৎসব অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে বাঙালির এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব পরিণত হয়েছে প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তুলে ধরার এক অনন্য উপলক্ষে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের সামনে বাঙালির শারদীয় উৎসব যেন ঘোষণা করছে—বাংলার সংস্কৃতি কেবল একটি ভূখণ্ডের সম্পদ নয়, এটি বিশ্বমানবতার সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য।

কিন্তু এই উৎসবের বর্ণিল আয়োজনের মধ্যেই রয়েছে আরেকটি দৃশ্য, যা উৎসবের আলোকচ্ছটাকে ছাপিয়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। যখন অনেকেই দেবী দুর্গার আরাধনা, আনন্দ-উৎসব ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মগ্ন, তখন নিউইয়র্কের কমিউনিটি নেতা শক্তি ডি গুপ্তা বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে জানাচ্ছেন তাঁর প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হওয়া চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মুক্তি দিতে হবে, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়টি ন্যায়সংগতভাবে বিবেচনা করতে হবে এবং ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

একদিকে উৎসবের মঞ্চে আলোর ঝলকানি, অন্যদিকে বৃষ্টিভেজা পরিবেশে একজন মানুষের প্রতিবাদী অবস্থান—দুটি দৃশ্য যেন একই সঙ্গে তুলে ধরে প্রবাসী বাঙালির জীবনের দুটি বাস্তবতা। একটি দৃশ্যে শিকড়ের টান, ঐতিহ্যের গৌরব ও উৎসবের আনন্দ; অন্য দৃশ্যে স্বজনদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের জন্য উদ্বেগ।

শক্তি ডি গুপ্তার এই অবস্থানের তাৎপর্য কেবল একজন ব্যক্তির প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়। প্রবাসে বসবাস করলেও বাংলাদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে যাঁরা উদ্বিগ্ন, তাঁদের কাছে এমন প্রতিবাদ একটি মানবিক বার্তা বহন করে। বৃষ্টি তাঁর অবস্থানকে কঠিন করে তুলতে পারে, কিন্তু তাঁর দাবির কেন্দ্রে রয়েছে এমন একটি প্রশ্ন, যার গুরুত্ব কোনো দেশ, ধর্ম কিংবা ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—একজন মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কতটা সুরক্ষিত?

বাংলাদেশে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর গ্রেপ্তার ও তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দেশে-বিদেশে উদ্বেগ ও বিতর্ক রয়েছে। তাঁর মুক্তি এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদকারীরা সরব। এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে আদালত ও প্রমাণ; একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় যেন তাঁর প্রতি বৈষম্য, হয়রানি কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই দাবির পরিসর আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশে কোনো সনাতনী বা হিন্দু নাগরিক যদি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হামলা, হুমকি, জবরদখল কিংবা অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকেন, তবে তাঁর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যদি নিরাপত্তাহীনতায় নিজের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হন, তবে তাঁর নিরাপদে ফিরে আসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর কেউ যদি মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তবে আইনসম্মত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, আর নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাঁর মুক্তি ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

রাষ্ট্রের শক্তি কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতায় নয়, নিরপরাধ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালনের মধ্যেও প্রকাশ পায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু—সব নাগরিকের জন্য একই আইনি সুরক্ষা, একই মর্যাদা এবং একই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয়।

দুর্গোৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্যও আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দেবী দুর্গার আরাধনা অশুভের বিরুদ্ধে শুভের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর প্রতীক। তাই দুর্গাপূজার মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন আমরা শান্তি, কল্যাণ ও মানবমুক্তির প্রার্থনা করি, তখন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নির্যাতিত মানুষের কষ্টের প্রতিও আমাদের সংবেদনশীল থাকা উচিত। অন্যের দুঃখকে উপেক্ষা করে নিজের আনন্দকে সম্পূর্ণ করা যায় কি না, সেই প্রশ্নও উৎসবের দিনগুলোতে আমাদের নিজেদের কাছে রাখা প্রয়োজন।

তবে এই প্রতিবাদ কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে আরেক ধর্মের অবস্থান নয়। এটি হওয়া উচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমঅধিকারের এবং ভয়ের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার পক্ষে অবস্থান। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা অন্য কোনো বিশ্বাসের মানুষ—প্রত্যেকেরই অধিকার রয়েছে নিজের ধর্ম পালন করার, নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করার এবং নিরাপদে জীবনযাপন করার। যে অধিকার একজন হিন্দুর জন্য প্রয়োজন, সেই অধিকার একজন মুসলমানের জন্যও সমানভাবে প্রয়োজন। মানবাধিকারের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই।

নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারের এই দুর্গোৎসব তাই কেবল প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক মিলনমেলা হয়ে থাকুক, তা নয়; এটি হয়ে উঠুক মানবিক মূল্যবোধেরও এক উজ্জ্বল মঞ্চ। বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে শক্তি ডি গুপ্তার প্রতিবাদ সেই মঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—আমরা কি কেবল উৎসবের আনন্দ উদ্‌যাপন করব, নাকি অন্যায়ের শিকার মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতেও সোচ্চার হব?

বাংলাদেশ সরকারের প্রতি তাই আহ্বান, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস প্রভুর মামলাগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করুন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি এবং আইনসম্মত অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিন। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে যাঁরা অন্যায়ভাবে আটক রয়েছেন, যাঁরা সহিংসতা ও হুমকির শিকার হয়েছেন কিংবা যাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিষয়ে আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আইনগত ভিত্তি নেই, তাঁদের মুক্তির পথ সুগম করুন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিন।

একই সঙ্গে প্রবাসী সমাজের প্রতিও আহ্বান—প্রতিবাদ হোক শান্তিপূর্ণ, দাবি হোক তথ্যনির্ভর, আর ভাষা হোক মানবিক। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে নয়, বরং সব সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই ন্যায়ের পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলা সম্ভব।

টাইমস স্কয়ারের আকাশে যখন উৎসবের আলো জ্বলছে, তখন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একজন প্রতিবাদী মানুষের দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আনন্দেরও একটি সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা শুধু নিজের পরিবারের সুখের জন্য নয়, অন্যের ঘরেও শান্তি ফিরে আসুক, ভীত মানুষের মনে সাহস জাগুক, অন্যায়ের শিকার মানুষ ন্যায়বিচার পাক এবং কোনো মানুষ যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন।

২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গোৎসবের স্মৃতি তাই শুধু ঢাকের শব্দ, আলোর ঝলকানি কিংবা সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। এই উৎসব স্মরণীয় হয়ে থাকুক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে, ন্যায়বিচারের দাবিতে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তায়।

বৃষ্টিভেজা টাইমস স্কয়ার থেকে উচ্চারিত হোক এক মানবিক আহ্বান—উৎসব সবার, নিরাপত্তা সবার, ন্যায়বিচার সবার। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন অন্যায়ের শিকার না হন, কোনো পরিবার যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভিটেমাটি হারানোর ভয় না পায়, আর কোনো নাগরিক যেন নিজের বিশ্বাসের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হয়ে না থাকেন।

শুভ শক্তির আরাধনায়, মানবতার জয়ে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায়—এটাই হোক এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
উত্তম কুমার সাহা,
সম্পাদক ও প্রকাশক 
প্রজ্ঞা নিউজ ।