Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   হিংসা, বিদ্বেষ আর অর্থের দাপটে কি হারিয়ে যাচ্ছে দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা? নিউইয়র্কে মন্দিরভিত্তিক পূজার পক্ষে সোচ্চার জয়দেব গাইন: ধর্ম পালন করলে ধর্মের নিয়ম মানতে হবে, মন্দির গড়তে হবে, পূজার নামে প্রতিযোগিতা নয়—আত্মশুদ্ধি ও ঐতিহ্য রক্ষাই হোক দুর্গোৎসবের মূল লক্ষ্য

হিংসা, বিদ্বেষ আর অর্থের দাপটে কি হারিয়ে যাচ্ছে দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা? নিউইয়র্কে মন্দিরভিত্তিক পূজার পক্ষে সোচ্চার জয়দেব গাইন: ধর্ম পালন করলে ধর্মের নিয়ম মানতে হবে, মন্দির গড়তে হবে, পূজার নামে প্রতিযোগিতা নয়—আত্মশুদ্ধি ও ঐতিহ্য রক্ষাই হোক দুর্গোৎসবের মূল লক্ষ্য

হিংসা, বিদ্বেষ আর অর্থের দাপটে কি হারিয়ে যাচ্ছে দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা? নিউইয়র্কে মন্দিরভিত্তিক পূজার পক্ষে সোচ্চার জয়দেব গাইন: ধর্ম পালন করলে ধর্মের নিয়ম মানতে হবে, মন্দির গড়তে হবে, পূজার নামে প্রতিযোগিতা নয়—আত্মশুদ্ধি ও ঐতিহ্য রক্ষাই হোক দুর্গোৎসবের মূল লক্ষ্য

উত্তম কুমার সাহা, প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক:

ঢাকের বাদ্য, ধূপের সুগন্ধ, মন্ত্রোচ্চারণ, অঞ্জলি, আরতি, প্রতিমার অপরূপ সৌন্দর্য আর আলোকসজ্জার বর্ণাঢ্য আয়োজন—শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। দেবী দুর্গার আরাধনাকে ঘিরে এই উৎসব শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং অসুরের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। কিন্তু উৎসবের এই জাঁকজমকের আড়ালে যদি হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, মিথ্যাচার, অর্থের দাপট, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা জায়গা করে নেয়, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি সত্যিই দুর্গাপূজার প্রকৃত শিক্ষা ধারণ করছি, নাকি শুধু পূজার আয়োজন করেই নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্ব শেষ করছি?

নিউইয়র্কের প্রবাসী সনাতনী সমাজে এই প্রশ্ন সামনে এনে মন্দির প্রতিষ্ঠা, মন্দিরভিত্তিক পূজা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন কমিউনিটির নেতা জয়দেব গাইন। তাঁর বক্তব্য, ধর্ম পালন করতে হলে ধর্মের নিয়ম ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পূজার নামে অর্থের প্রভাব, সামাজিক অবস্থান প্রদর্শন কিংবা ব্যক্তিগত পরিচিতি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা নয়, বরং ধর্মীয় মূল্যবোধ, আচারবিধি, ভক্তি ও স্থায়ী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

জয়দেব গাইনের মতে, বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে হল ভাড়া নিয়ে দুর্গাপূজা ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে সেই ব্যয়ের একটি অংশ মন্দির নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ব্যয় করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি মন্দির শুধু পূজার স্থান নয়, এটি প্রবাসে ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা, নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিক্ষায় যুক্ত করা এবং সনাতনী সম্প্রদায়ের স্থায়ী মিলনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

জয়দেব গাইন তাঁর বক্তব্যে বলেন, আমি আমার ধর্মের পক্ষে, ধর্মের নিয়মের পক্ষে, মন্দির করার পক্ষে। ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী পূজা করার অনুরোধ করি। কিন্তু আমাদের কমিউনিটির কিছুসংখ্যক মানুষের অন্যায়, মিথ্যা, নিয়মবহির্ভূতভাবে পূজা উদযাপন, টাকার প্রভাব এবং সমাজে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার জন্য হল ভাড়া করে পূজা আয়োজনের প্রবণতার বিরুদ্ধে আমি প্রতিবাদ করি। আমি মন্দিরভিত্তিক পূজা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসব উদযাপনের অনুরোধ জানাই।

তিনি আরও বলেন, তাঁর এই অবস্থানের কারণে কমিউনিটির কিছু মানুষের সমালোচনার মুখেও পড়তে হচ্ছে তাঁকে। তবে সমালোচনার ভয়ে ধর্মীয় আদর্শ ও নিজের বিশ্বাস থেকে সরে আসতে চান না তিনি। তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হলে ধর্মের নিয়ম, আচারবিধি ও মূল্যবোধকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

জয়দেব গাইনের অভিযোগ, সমাজের কিছু মানুষ পূজার আয়োজনকে নিজেদের সামাজিক অবস্থান, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা প্রভাব প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষের কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরা, তাহলে সেই আয়োজনের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন, মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। 

ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিগত জীবনাচরণের প্রসঙ্গ তুলে জয়দেব গাইন আরও বলেন, বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে শাখা-সিঁদুরের মতো কিছু প্রচলিত রীতির সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি ঐতিহ্য, ধর্মীয় শিক্ষা ও আচার-অনুশীলনের প্রতিও আন্তরিকতা থাকা দরকার। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মানুষ নিয়মিত ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করলেও বড় আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের ধর্মীয় অবদানের পরিচয় তুলে ধরতে চান। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা শুধু প্রচার বা প্রদর্শনের বিষয় নয়; তা মানুষের আচরণ, বিশ্বাস, অনুশীলন ও দায়িত্ববোধের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পাওয়া উচিত।

তবে ধর্মীয় নিষ্ঠা বিচার করার ক্ষেত্রে ব্যক্তির পোশাক কিংবা কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে উপস্থিতির ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন নয়। হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও পরিবারের আচার-অনুশীলনে বৈচিত্র্য রয়েছে। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, যুক্তি ও সহনশীলতার ভিত্তিতে। জয়দেব গাইনের বক্তব্যের বৃহত্তর তাৎপর্য হলো, ধর্মীয় আয়োজন যেন ব্যক্তিগত অহংকারের পরিবর্তে ভক্তি, সেবা, ঐতিহ্য রক্ষা এবং সমাজের সম্মিলিত কল্যাণের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

হিন্দুধর্মের শাক্ত ঐতিহ্যে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবীমাহাত্ম্যম্ বা দুর্গাসপ্তশতীতে বর্ণিত মহিষাসুর বধের আখ্যান সেই ধর্মীয় দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। এই কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা। সেই শিক্ষাকে ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগ করতে হলে অহংকার, লোভ, হিংসা, বিদ্বেষ ও অসত্যের বিরুদ্ধেও নিজের অবস্থান পর্যালোচনা করতে হয়।

দেবীর সামনে অঞ্জলি দেওয়া, মন্ত্র পাঠ করা, আরতি করা কিংবা পূজার আয়োজন করা ধর্মীয় অনুশীলনের অংশ। কিন্তু সেই সঙ্গে সত্যনিষ্ঠা, বিনয়, সহমর্মিতা, পরোপকার এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের চর্চাও গুরুত্বপূর্ণ। পূজার প্রকৃত শিক্ষা তখনই সামাজিক জীবনে প্রতিফলিত হয়, যখন ধর্মের নামে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা এবং ব্যক্তিস্বার্থের পরিবর্তে বৃহত্তর কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নিউইয়র্কের মতো ব্যয়বহুল শহরে একটি স্থায়ী মন্দির প্রতিষ্ঠা কিংবা বিদ্যমান মন্দিরের উন্নয়ন করা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন অর্থ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সাংগঠনিক ঐক্য, আইনগত প্রক্রিয়া এবং নিয়মিত পরিচালনার ব্যবস্থা। একই সঙ্গে হল ভাড়া করে পূজা আয়োজনেরও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। অনেক সংগঠনের নিজস্ব মন্দির নেই, তাই ভাড়া করা স্থানে পূজা আয়োজনই তাদের জন্য বাস্তবসম্মত উপায়। সুতরাং হলভিত্তিক পূজাকে এককভাবে ধর্মবিরোধী বলে চিহ্নিত না করে, কীভাবে এই আয়োজনের পাশাপাশি স্থায়ী ধর্মীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, সেই বাস্তবসম্মত পথ খোঁজা জরুরি।

যেসব সংগঠন বছরের পর বছর বড় বাজেটে পূজা আয়োজন করে, তারা চাইলে মন্দির উন্নয়নের জন্য আলাদা তহবিল গঠন করতে পারে। যেসব মন্দির সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোর উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা যেতে পারে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তারা অর্থের পাশাপাশি স্বেচ্ছাশ্রম, সাংগঠনিক সহযোগিতা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারেন। এতে একদিকে পূজার ঐতিহ্য বজায় থাকবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথও সুগম হবে।

জয়দেব গাইন বলেন, আমি আমার ধর্ম নিয়ে কাজ করি। আমার কথা হলো, ধর্মই যদি পালন করি, তাহলে ধর্মের নিয়ম অনুসরণ করব না কেন? তাঁর দাবি, সমাজের পরিবর্তন করা কঠিন হলেও সেই পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান তুলে ধরার জন্য তিনি প্রজ্ঞা নিউজকে ধন্যবাদ জানান। সমালোচনা থাকলেও নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মীয় আদর্শ ও মন্দিরভিত্তিক পূজার পক্ষে কথা বলে যেতে চান তিনি।

প্রবাসে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু কোনো একজন ব্যক্তি কিংবা সংগঠনের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্ব। মন্দির নির্মাণ, ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে পরিচিত করার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ কিংবা সামাজিক বিভাজনে পরিণত না হয়।

দুর্গাপূজার সার্থকতা শুধু কত বড় মণ্ডপ তৈরি হলো, কত অর্থ ব্যয় হলো, কত মানুষ উপস্থিত হলেন কিংবা কে কত বেশি পরিচিতি পেলেন—তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একই সঙ্গে একটি পূজা কতটা নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন হলো, ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষায় কতটা অবদান রাখল, মানুষের মধ্যে কতটা সম্প্রীতি তৈরি করল এবং সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কতটা ভূমিকা রাখল, সেসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

জয়দেব গাইনের আহ্বান নিউইয়র্কের সনাতনী সমাজের সামনে একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সবাই একমত হবেন, এমন নয়। কিন্তু মন্দির উন্নয়ন, ধর্মীয় মূল্যবোধ, উৎসবের ব্যয়ের যথাযথ ব্যবহার এবং সামাজিক ঐক্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হওয়া জরুরি।

মা দুর্গার আরাধনা হোক অন্তরের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার অঙ্গীকার। ধর্মীয় উৎসব হোক ভক্তি, মানবিকতা ও ঐতিহ্য রক্ষার মাধ্যম। অর্থের দাপট নয়, ধর্মীয় নিষ্ঠা; অহংকার নয়, বিনয়; বিদ্বেষ নয়, সম্প্রীতি—এই মূল্যবোধগুলোই হোক শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রকৃত শিক্ষা।