অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় খোকনের শেষ বিদায়, ৩০ বছর পর নিথর দেহ ফিরছে প্রিয় বাংলাদেশে: নিউইয়র্কে জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল, নিখোঁজের পাঁচ দিন পর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ প্রবাসী কমিউনিটি
উত্তম কুমার সাহা, প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক, নিউইয়র্ক:
অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা, বুকভরা স্মৃতি আর স্বজন হারানোর গভীর বেদনা নিয়ে প্রিয় মানুষ কাজী আজিজুল হক খোকনকে শেষ বিদায় জানালেন নিউইয়র্কের শত শত মানুষ। দীর্ঘ তিন দশকের প্রবাসজীবনের অবসান ঘটিয়ে তাঁর নিথর দেহ ফিরে যাচ্ছে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, দুপুরে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় তাঁর নামাজে জানাজা। একই দিন রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর কথা রয়েছে।
মাত্র ৫৭ বছর বয়সে খোকনের আকস্মিক মৃত্যুতে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, জানাজায় মানুষের উপস্থিতি যেন তারই প্রতিচ্ছবি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাকর্মী, বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ অসংখ্য মানুষ তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানানোর মুহূর্তে অনেকেই অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। ডাইভারসিটি প্লাজায় সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের।
জানাজার আগে মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, হোসেন রানা এবং যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল আহমেদ। বক্তারা খোকনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অনেকের কাছেই খোকন ছিলেন শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মী নন, বরং দীর্ঘদিনের বন্ধু, আপনজন ও নির্ভরতার একটি পরিচিত মুখ।
কাজী আজিজুল হক খোকনের মৃত্যু যতটা আকস্মিক, তাঁর শেষ সময়ের ঘটনাপ্রবাহও ততটাই বেদনাবিধুর। গত ৩ অক্টোবর, শনিবার, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাঁর খোঁজ না পাওয়ায় পরিবার, বন্ধু, পরিচিতজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সন্ধান চেয়ে আবেগঘন পোস্ট দেন। পরিচিতজনেরা বিভিন্নভাবে তাঁর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা চালান।
বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নুল আবেদীন জানান, শনিবার বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর বাসার পাশের রাস্তায় হঠাৎ পড়ে যান খোকন। অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে পড়ে থাকতে দেখে কেউ পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে জ্যামাইকা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রাথমিকভাবে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে জানা গেলেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার জন্য তাঁর মরদেহ ব্রুকলিনের ৫৯৯ উইনথ্রপ স্ট্রিটে অবস্থিত Office of the Medical Examiner-এ নেওয়া হয়।
মৃত্যুর খবর তাৎক্ষণিকভাবে কমিউনিটির সর্বত্র পৌঁছায়নি। ফলে কয়েক দিন ধরে তাঁকে খুঁজছিলেন পরিচিতজনেরা। অবশেষে বুধবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলিন ও অ্যাস্টোরিয়াসসহ বিভিন্ন এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
যে মানুষটির সন্ধানে কয়েক দিন ধরে উদ্বিগ্ন ছিলেন তাঁর বন্ধু, স্বজন ও সহকর্মীরা, শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর জীবিত ফিরে পাওয়া গেল না। প্রিয়জনের সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হলো মৃত্যুসংবাদে। সেই বেদনার রেশ নিয়েই শুক্রবার অনুষ্ঠিত হলো তাঁর শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা।
খোকনের মরদেহ দেশে পাঠানো এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য জানাজার আগের দিন, বৃহস্পতিবার, একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে ১০ ডলার করে অনুদান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। সংগৃহীত অর্থ তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘ ৩০ বছর পর খোকনের নিথর দেহ ফিরছে তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে। প্রবাসের মাটিতে যাঁদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও স্মৃতির বন্ধন গড়ে উঠেছিল, তাঁদের কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছেন দেশের বাড়িতে।
তাঁর দেশের বাড়ি যশোর জেলার আলোকদিয়ায়। বাংলাদেশে তাঁর তিন ভাই ও দুই বোন রয়েছেন। প্রবাসে পরিচিতজনদের কাছে আপন মানুষ হয়ে ওঠা খোকনের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর অপেক্ষায় এখন তাঁর স্বজনেরা।
যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত ছিলেন কাজী আজিজুল হক খোকন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর ছিল গভীর রাজনৈতিক আনুগত্য। দীপু মনির প্রতিও তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধা ও সমর্থনের কথা পরিচিতজনেরা স্মরণ করেন।
তবে খোকনের পরিচয় কেবল রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত, সহজ-সরল, আন্তরিক ও বন্ধুবৎসল একজন মানুষ। রাজনৈতিক বিশ্বাসে অবিচল থেকেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে দল, ধর্ম, বর্ণ কিংবা মতের বিভেদকে প্রাধান্য দিতেন না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মানুষের সঙ্গে তাঁর অবাধ যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব ছিল।
তাঁকে যারা কাছ থেকে চিনতেন, তাঁদের কাছে খোকনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মানবিকতা। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে তিনি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতেন, পরিচিতজনদের আপন করে নিতেন। তাঁর এই সহজাত আন্তরিকতাই তাঁকে কমিউনিটির বহু মানুষের কাছে প্রিয় করে তুলেছিল।
রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, বর্তমানে দুনিয়া কৃত্রিমতায় ভরে গেছে, আসল আর নকলের পার্থক্য সহজে বোঝা যায় না। পরিচিতজনদের কাছে তাঁর এই মন্তব্য ছিল সময় ও সমাজ সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধির প্রকাশ।
খোকনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন কমিউনিটির নেতা কাজল মাহমুদ ও গোলাম খান লিপটন। তাঁরা জানান, খোকন কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তাঁর মৃত্যুতে তাঁরা গভীরভাবে শোকাহত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই খোকনের সঙ্গে কাটানো সময়ের স্মৃতিচারণ করছেন। কেউ তাঁকে দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবে স্মরণ করছেন, কেউবা রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, আবার কেউ তাঁকে মনে করছেন একজন অকৃত্রিম ও আন্তরিক মানুষ হিসেবে।
তাঁর পরিচিতজনদের কাছে খোকনের মৃত্যু যেন জীবনের এক কঠিন বাস্তবতার স্মারক। দীর্ঘদিন পাশাপাশি চলা, আড্ডা দেওয়া, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া মানুষটি হঠাৎ করেই স্মৃতির মানুষ হয়ে গেলেন। প্রবাসের মাটিতে তাঁর সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কগুলো এখন বয়ে বেড়াবে তাঁর অনুপস্থিতির শূন্যতা।
একজন প্রবাসীর জীবন শুধু তাঁর পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিনের বসবাসে তিনি হয়ে ওঠেন একটি কমিউনিটির অংশ, অসংখ্য মানুষের স্মৃতি ও সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কাজী আজিজুল হক খোকনের আকস্মিক মৃত্যুতে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি হারাল তেমনই একজন পরিচিত মানুষকে।
কয়েক দিন আগেও যাঁর সন্ধানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুতি জানিয়েছিলেন বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা, শুক্রবার তাঁর জানাজায় সেই মানুষটির জন্যই চোখের জল ফেললেন শত শত মানুষ। জীবনের শেষ যাত্রায় খোকনকে ঘিরে মানুষের এই ভালোবাসা প্রমাণ করেছে, তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল।
সময়ের প্রবাহে হয়তো অনেক স্মৃতি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়, আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক সহজে ভোলা যায় না। খোকনের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে তিনি তেমনই একজন মানুষ হয়ে থাকবেন।
কাজী আজিজুল হক খোকনের মৃত্যুতে শোকাহত নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁরা মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এই কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কমিউনিটির সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শুভানুধ্যায়ীরা।
প্রজ্ঞা নিউজ পরিবারের পক্ষ থেকেও কাজী আজিজুল হক খোকনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানানো হচ্ছে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা।
প্রবাসের মাটিতে তিন দশকের জীবন শেষে খোকন ফিরছেন তাঁর জন্মভূমিতে। পেছনে রেখে যাচ্ছেন অসংখ্য স্মৃতি, ভালোবাসা আর এক বুক শূন্যতা। নিউইয়র্কের ডাইভারসিটি প্লাজায় অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাঁর প্রবাসজীবনের অধ্যায়, কিন্তু তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্মৃতি থেকে যাবে দীর্ঘদিন।



















