Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   বিশ্বমঞ্চে বাঙালির শারদীয় ঐতিহ্য, টাইমস স্কয়ারে ‘মহামিলন ২০২৬’; সম্মাননা পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় ঐতিহ্যবাহী সংগঠন

বিশ্বমঞ্চে বাঙালির শারদীয় ঐতিহ্য, টাইমস স্কয়ারে ‘মহামিলন ২০২৬’; সম্মাননা পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় ঐতিহ্যবাহী সংগঠন

বিশ্বমঞ্চে বাঙালির শারদীয় ঐতিহ্য, টাইমস স্কয়ারে ‘মহামিলন ২০২৬’; সম্মাননা পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় ঐতিহ্যবাহী সংগঠন

উত্তম কুমার সাহা , প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :

শারদীয় দুর্গোৎসবের ধর্মীয় আবহ, মহালয়ার চণ্ডীপাঠ, দেবী বন্দনা এবং বাঙালির সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে আবারও প্রস্তুত নিউইয়র্কের বিশ্বখ্যাত টাইমস স্কয়ার। আগামী ১০ ও ১১ অক্টোবর দুই দিনব্যাপী ‘মহামিলন ২০২৬’ শীর্ষক মহালয়া ও শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছে টাইমস স্কয়ার দুর্গোৎসব অ্যাসোসিয়েশন। দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এই উৎসবকে ঘিরে প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।

ম্যানহাটনের প্রাণকেন্দ্র ফাদার ডাফি স্কয়ারে অনুষ্ঠিতব্য এই আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিক চেতনা, শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য এবং অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধের আন্তর্জাতিক প্রকাশ। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বাঙালি এবং নানা সংস্কৃতির মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবটি পরিণত হতে যাচ্ছে সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক বর্ণাঢ্য মিলনমেলায়।

দুর্গোৎসবের অন্তর্নিহিত শক্তি অশুভের বিনাশ ও শুভশক্তির জাগরণ। দেবী দুর্গার আবাহন, মহিষাসুরমর্দিনীর মাহাত্ম্য এবং মহালয়ার চণ্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে যে ধর্মীয় আবেগ ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির সূচনা হয়, নিউইয়র্কের ব্যস্ত নগরজীবনের কেন্দ্রে সেই চিরন্তন বাণীই তুলে ধরবে এবারের ‘মহামিলন ২০২৬’। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বাঙালির সংস্কৃতি ও মানবিক ঐক্যের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করাই এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।

১০ অক্টোবর শনিবার মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠান, চণ্ডীপাঠ, দেবী বন্দনা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হবে। দিনের কর্মসূচিতে থাকবে আনুষ্ঠানিক পর্ব, আমন্ত্রিত অতিথিদের বক্তব্য এবং সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা। মহালয়ার আবহে দেবীপক্ষের সূচনাকে কেন্দ্র করে বাঙালির ধর্মীয় অনুভূতি ও শারদীয় আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন আয়োজকেরা।

১১ অক্টোবর রবিবার অনুষ্ঠিত হবে দুর্গাপূজার বিশেষ আয়োজন। কর্মসূচিতে থাকছে পূজা-অর্চনা, গীতাপাঠ, ধুনুচি নাচ, সিঁদুরখেলা, সংগীত, নৃত্য এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দেশ-বিদেশের শিল্পী ও তারকাদের অংশগ্রহণে উৎসবের মঞ্চ হয়ে উঠবে আরও প্রাণবন্ত। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে বাঙালির লোকজ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন আয়োজকেরা।

এবারের উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন, বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং প্রবাসে ঐতিহ্য সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে অবদান রেখে চলা ছয়টি সংগঠনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান। সম্মাননা পেতে যাচ্ছে ক্যালিফোর্নিয়ার Bay Area Prabasi Inc., ইলিনয়ের Bengali Association of Greater Chicago (BAGC), ওহাইওর Bengali Cultural Society, নিউইয়র্কের East Coast Durga Puja Association, নিউ জার্সির Kallol এবং পেনসিলভানিয়ার Pragati।

প্রবাসে বাংলা ভাষা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক বন্ধনকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব সংগঠনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, দুর্গোৎসব আয়োজন এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঙালির পরিচয় ও ঐতিহ্য পরিচিত করার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে সম্মাননা স্মারক। এই উদ্যোগ প্রবাসী সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অবদানকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঐতিহ্য সংরক্ষণে উৎসাহিত করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে নিউইয়র্কের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং প্রবাসী কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের কনস্যুলার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও উৎসবকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে বিশেষ স্মরণিকা ‘টাইমস স্কয়ার শারদীয়া ২০২৬’। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এই স্মরণিকায় স্থান পেয়েছে দুর্গাপূজার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বাংলাদেশ ও ভারতে শারদীয় উৎসবের বিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গাপূজার বিস্তার, মহালয়ার সাংস্কৃতিক তাৎপর্য এবং প্রবাসী বাঙালিদের অবদান নিয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ ও শুভেচ্ছাবার্তা। স্মরণিকায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তীর শুভেচ্ছাবার্তার পাশাপাশি নিউইয়র্কের মেয়রের কার্যালয়ের শুভেচ্ছাবার্তা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্মরণিকাটি সম্পাদনা করেছেন বিশ্বজিৎ সাহা।

টাইমস স্কয়ার দুর্গোৎসব অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শশধর হাওলাদার ও সাধারণ সম্পাদক নিরুপমা সাহার নেতৃত্বে এই দুই দিনের আয়োজন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে। তাঁদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের সমন্বয়ে ‘মহামিলন ২০২৬’ প্রবাসী বাঙালিদের জন্য একটি স্মরণীয় উৎসবে পরিণত হবে।

বিশ্বের অন্যতম পরিচিত জনসমাগমস্থল টাইমস স্কয়ারে দুর্গোৎসবের আয়োজন প্রবাসে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। বহুজাতিক ও বহুভাষিক এই নগরীতে দেবী দুর্গার আরাধনা এবং বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সামনে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিক ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

‘মহামিলন ২০২৬’-এর মূল দর্শন ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানার ঊর্ধ্বে মানুষের মিলন। দুর্গোৎসবের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া, সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং মানবতার বন্ধনকে শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আয়োজকেরা।

দুই দিনের এই উৎসবে নিউইয়র্কের বিশ্বখ্যাত টাইমস স্কয়ারে একদিকে যেমন ধ্বনিত হবে চণ্ডীপাঠ ও দেবী বন্দনার পবিত্র আবহ, অন্যদিকে সংগীত, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাবে বাঙালির প্রাণের উৎসব। শারদীয় আনন্দকে বিশ্বজনীন সম্প্রীতির বন্ধনে যুক্ত করার প্রত্যয়ে ‘মহামিলন ২০২৬’ হয়ে উঠতে চায় বাঙালির ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল আন্তর্জাতিক পরিচয়।

উৎসবের আহ্বান একটাই—ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন। কারণ শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, শুভশক্তির জয়, মানবিক চেতনার জাগরণ এবং সম্প্রীতির বন্ধনকে নতুন করে দৃঢ় করারও এক মহৎ প্রেরণা।