বেসমেন্টের ছোট ঘর থেকে ১.১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, মাহফুজ আহমেদের অনন্য বাংলাদেশ-আমেরিকা সাফল্যগাথা
উত্তম কুমার সাহা, প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
একদিকে উত্তর ভার্জিনিয়ার একটি বাড়ির ছোট বেসমেন্ট। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কর্মীর বিশাল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। মাঝখানে রয়েছে প্রায় তিন দশকের কঠোর পরিশ্রম, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা এবং একজন বাংলাদেশি তরুণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প।
এই গল্পের নায়ক মাহফুজ আহমেদ। ১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা সেই তরুণ আজ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও জনশক্তি সেবা প্রতিষ্ঠান ডেক্সিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
১৯৮৯ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন মাহফুজ। ভর্তি হন ভার্জিনিয়ার জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটিতে। নতুন দেশে জীবন শুরুটা ছিল সহজ নয়। থাকার খরচ কমাতে গ্রেট ফলসে মামার বাড়িতে থাকতেন। পড়াশোনার খরচের একটি অংশ বহন করতেন তাঁর মা, আর প্রয়োজনের সময় আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও অর্থ ধার করতে হয়েছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতেন মাহফুজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিং হল, মনোবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগসহ বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করেন। জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রথম দিকের চাকরিগুলোর একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবে। ছাত্রজীবনের সেই সংগ্রামই পরবর্তী উদ্যোক্তা জীবনের জন্য তাঁকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস দেয়।
ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করার পর প্রযুক্তি খাতে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলেও পড়াশোনা করেন। নর্থরপ গ্রুম্যানে পরামর্শক এবং মবিল অয়েলে জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তি ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময় বড় প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত চাহিদা এবং দক্ষ কর্মীর সংকটকে কাছ থেকে দেখেন।
চাকরির অভিজ্ঞতা থেকেই ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে পান মাহফুজ। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ডিজিটাল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমস বা ডিসিস। শুরুটা ছিল অত্যন্ত ছোট—উত্তর ভার্জিনিয়ার একটি বাড়ির বেসমেন্টে।
দিনে চাকরি, রাতে নিজের ব্যবসা। সপ্তাহান্তে গ্রাহক খোঁজা, ব্যবসার পরিকল্পনা এবং নতুন কাজের চেষ্টা। প্রথম দুই বছর ব্যবসা থেকে নিজেদের জন্য কোনো অর্থ নেননি দুই উদ্যোক্তা; যা আয় হতো, তা আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হতো। কখনো দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন মাহফুজ।
পরবর্তী সময়ে তাঁর ভাই মারুফ আহমেদ ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন। ১৯৯৯ সালে মারুফের সহপ্রতিষ্ঠিত একটি তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী সরবরাহ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিসিসের সঙ্গে একীভূত হয়। মারুফ পরে অংশীদার ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। দুই ভাইয়ের যৌথ নেতৃত্বে ব্যবসা নতুন গতি পায়।
এরপর আসে Y2K যুগ। ২০০০ সালকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে কম্পিউটার ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের প্রযুক্তি অবকাঠামো পরীক্ষা ও হালনাগাদ করতে শুরু করে। বেড়ে যায় দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ও প্রযুক্তি সেবার চাহিদা। সেই সময় ডিসিসও বড় গ্রাহক পেতে শুরু করে এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি কর্মী সরবরাহের পাশাপাশি প্রযুক্তি পরামর্শ ও সমাধান দেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবসা বিস্তৃত করে ডিসিস। ২০২১ সালে ফ্লোরিডাভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিগনেচার কনসালট্যান্টস অধিগ্রহণের মাধ্যমে সম্প্রসারণ আরও জোরদার হয়।
২০২৩ সালে ডিসিস, সিগনেচার কনসালট্যান্টস এবং অন্যান্য অধিগ্রহণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ব্যবসাগুলোকে একত্র করে আত্মপ্রকাশ করে নতুন ব্র্যান্ড ডেক্সিয়ান।
বর্তমানে ডেক্সিয়ানের কার্যক্রম উত্তর ও লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ, ভারত এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিস্তৃত। ভার্জিনিয়া বিজনেসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৭০টির বেশি স্থানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে এবং কর্মী সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার। বিশ্বের বহু ফরচুন ৫০০ প্রতিষ্ঠানও এর গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে।
২০২৪ সালে ডেক্সিয়ানের রাজস্ব দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। একই সময়ে ওয়াশিংটন ডিসি অঞ্চলের সংখ্যালঘু মালিকানাধীন বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায়ও ডেক্সিয়ান শীর্ষস্থানীয় অবস্থান অর্জন করে।
ব্যবসা যখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন মাহফুজ আহমেদ ধীরে ধীরে দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরে কৌশলগত নেতৃত্বে মনোযোগ দেন। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব ভাই মারুফ আহমেদের হাতে তুলে দেন তিনি। এর আগে মারুফ প্রেসিডেন্ট ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। মাহফুজ দায়িত্ব নেন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে।
বর্তমানে চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, আর্থিক পরিকল্পনা ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কৌশলগত তদারকিতে যুক্ত রয়েছেন।
উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁর সাফল্য বিভিন্ন পর্যায়ে স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০১৩ সালে বৃহত্তর ওয়াশিংটন অঞ্চলে আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের বর্ষসেরা উদ্যোক্তা পুরস্কার পান মাহফুজ। জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে। ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও কম্পিউটিং কলেজে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দান করেন তিনি। তাঁর অনুদানে ডিনস টেকনোলজি ইনোভেশন ফান্ড গড়ে তোলা হয়।
২০২৩ সালে জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি মাহফুজ ও মারুফ আহমেদকে তাঁদের সাফল্য ও অবদানের জন্য সম্মানিত করে। তবে সেই সম্মাননার সঙ্গে যুক্ত একটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মারুফ আহমেদ পড়াশোনার খরচ চালাতে বিভিন্ন কাজ করতেন। ফেনউইক লাইব্রেরির সামনে ময়লার ঝুড়ি পরিষ্কার করাও ছিল তাঁর দায়িত্বের অংশ। বহু বছর পর দুই ভাই যখন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন, তখন তাঁরা কোনো জমকালো স্থাপনা নিজেদের নামে উৎসর্গ করার দাবি করেননি। বরং সেই পরিচিত ময়লার ঝুড়িটিকেই তাঁদের নামে উৎসর্গ করার অনুরোধ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের অনুরোধ গ্রহণ করে। সাধারণ একটি ময়লার ঝুড়ি হয়ে ওঠে দুই ভাইয়ের কাছে সংগ্রামের দিনগুলোর স্মারক—যে সময় সাফল্য ছিল কেবল স্বপ্ন, আর প্রতিটি অর্জনের পেছনে ছিল কঠোর পরিশ্রম।
মাহফুজ আহমেদের গল্প তাই শুধু একটি বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানের উত্থানের গল্প নয়। এটি অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা, সীমিত সামর্থ্য থেকে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায়ের গল্প।
১৮ বছর বয়সে অচেনা দেশে এসে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকা, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করা, আর্থিক সংকট সামলানো, চাকরির পাশাপাশি বেসমেন্টে ব্যবসা শুরু করা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর যাত্রা ছিল ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
আজ সেই বেসমেন্টের ছোট উদ্যোগের উত্তরাধিকার বহনকারী প্রতিষ্ঠান ডেক্সিয়ানের রাজস্ব এক বিলিয়ন ডলারের বেশি, কর্মী প্রায় ১২ হাজার এবং কার্যক্রম ছড়িয়ে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে।
একসময় যে তরুণকে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে কাজ করতে হয়েছিল, তিনিই আজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও জনশক্তি সেবা খাতের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। মাহফুজ আহমেদের এই পথচলা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি নতুন প্রজন্মের জন্যও একটি শক্তিশালী বার্তা—শুরুটা যত ছোটই হোক, লক্ষ্য বড় হলে এবং পরিশ্রম অব্যাহত রাখলে সাফল্যের পরিধিও একসময় সীমাহীন হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র : প্রজন্ম কথা



















