নিউইয়র্কে প্রবাহের ২১তম সাহিত্য সভা: আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যকীর্তি স্মরণ, বাংলা সাহিত্যে পরাবাস্তববাদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান তুলে ধরলেন কবি কাজী জহিরুল ইসলাম
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সব্যসাচী কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শক্তিশালী সাহিত্য সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্য সংগঠন ‘প্রবাহ’-এর ২১তম সাহিত্য সভা। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় জ্যাকসন হাইটসের গ্রীনটাচ সেন্টারে আয়োজিত এ সভায় কবির সাহিত্যকর্ম, বাংলা সাহিত্যে পরাবাস্তববাদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা এবং জীবনানন্দ দাশ ও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও মূল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। সোহেল হামিদের সঞ্চালনায় এবং জনাব আবদুল জলিলের পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কবি কাজী জহিরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে আবদুল মান্নান সৈয়দের স্বতন্ত্র অবস্থান ও বহুমাত্রিক সাহিত্যসাধনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্যে পরাবাস্তববাদী কবিতার চর্চা ও প্রতিষ্ঠায় আবদুল মান্নান সৈয়দের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রেতোঁর হাত ধরে পরাবাস্তববাদী সাহিত্য আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। আবদুল মান্নান সৈয়দ এই সাহিত্যিক ধারণাকে বাংলা সাহিত্যের পাঠক ও লেখকদের কাছে পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি এর নন্দনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
কাজী জহিরুল ইসলাম বলেন, বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে অনেক কবির লেখায় পরাবাস্তবতার প্রকাশ ঘটেছে। তবে এই সাহিত্যধারাকে সচেতনভাবে চর্চা, বিশ্লেষণ ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আবদুল মান্নান সৈয়দের ভূমিকা বিশেষ স্বীকৃতির দাবি রাখে। এ প্রসঙ্গে তিনি কবিতায় পরাবাস্তবতার ধারণা, বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগ নিয়ে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের সামনে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও আবদুল মান্নান সৈয়দের অবদান তুলে ধরেন প্রধান আলোচক। তিনি বলেন, জীবনানন্দ দাশ ও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর গবেষণা বাংলা সাহিত্য সমালোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে। একজন শক্তিশালী সাহিত্য সমালোচক হিসেবে তিনি নিজস্ব বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি ও গভীর সাহিত্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন। জীবনানন্দ দাশকে ‘শুদ্ধতম কবি’ হিসেবে অভিহিত করার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কবিতার মূল্যায়নে একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেন।
আলোচনা পর্বের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি, সাহিত্য আলোচনা ও সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কবির সাহিত্যকর্মকে স্মরণ করা হয়।
কবিতা পর্বে কবি নুরুল মোস্তফা রইসী আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতার পাশাপাশি সৈয়দ শামসুল হকের পরাণের গহীন ভিতর কাব্যগ্রন্থ থেকে একটি সনেট এবং সুকুমার রায়ের ‘বিষম চিন্তা’ ছড়া আবৃত্তি করেন। বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী এম. এ. সাদেক আবৃত্তি করেন আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখা একটি কবিতা।
সাহিত্য সংগঠক সৈয়দ ফজলুর রহমান কবির সাহিত্যকর্ম ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। বিশিষ্ট টেলিভিশন উপস্থাপক ও বাচিকশিল্পী জি. এম. ফারুক খান আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘চুরুলিয়ার ছোট্ট ছেলে’ ও ‘সুন্দর’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করেন। কবি রওশন হক পাঠ করেন কবির ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’ কবিতাটি। জাকির হাওলাদার আবৃত্তি করেন ‘পাঁচটি উজ্জ্বল মাছ’ এবং সোহেল হামিদ পাঠ করেন ‘গ্রিনরোড’ কবিতাটি। আবদুল জলিল তাঁর স্বরচিত কবিতা ‘মানুষ’ আবৃত্তি করেন।
সংগীত পর্বে সেলিম শাহরিয়ারের কণ্ঠে ‘তুমি কখন এসে দাঁড়িয়ে আছো’ গানটি উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের মুগ্ধ করে।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন গ্রীনটাচের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লিয়াকত ইলাহি ও মুনতাকিম বিল্লাহ। বক্তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা, প্রবাসে সাহিত্যভিত্তিক সংগঠনের ভূমিকা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যকীর্তি স্মরণে আয়োজিত এ সভায় কবিতা, গবেষণা, সাহিত্য সমালোচনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল জীবনের বিভিন্ন দিক নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে। অনুষ্ঠানের আলোচকরা কবির সাহিত্যিক অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।



















