অভিবাসনে বদলে যাচ্ছে আমেরিকার ধর্মীয় মানচিত্র: মসজিদ, মন্দির ও ইসলামিক স্কুলের বিস্তার; পুরোনো চার্চ ও বাণিজ্যিক ভবন রূপ নিচ্ছে নতুন উপাসনালয়ে
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
অভিবাসনের ধারাবাহিক প্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে। একসময় প্রধানত খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হিসেবে পরিচিত বহু এলাকার দৃশ্যপটে এখন পাশাপাশি স্থান করে নিচ্ছে মসজিদ, ইসলামিক স্কুল, হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বহুধর্মীয় কমিউনিটি সেন্টার। বিশেষ করে নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস ও ইলিনয়ের মতো অভিবাসী অধ্যুষিত রাজ্যগুলোতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের দৃশ্যমান অংশ হয়ে উঠেছে।
এই পরিবর্তন কেবল নতুন উপাসনালয় নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো চার্চ, বাড়ি, অফিস, গুদাম কিংবা বাণিজ্যিক ভবন কিনে সেগুলোকে মসজিদ, মন্দির বা ধর্মীয় কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে একদিকে ধর্মীয় উপাসনার স্থান তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অভিবাসী পরিবারগুলোর শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন পরিসর গড়ে উঠছে।
জনসংখ্যার পরিসংখ্যানেও এই পরিবর্তনের ভিত্তি স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, অভিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের উপস্থিতি এবং নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে দেশটির ধর্মীয় বৈচিত্র্য ক্রমেই আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরোর ২০২২ সালের আমেরিকান কমিউনিটি সার্ভে (এসিএস) অনুযায়ী, দেশটিতে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৬২ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি। অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিদেশে জন্ম নেওয়া জনসংখ্যা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তি, স্থায়ী বাসিন্দা, অস্থায়ী অভিবাসী, শরণার্থী এবং অন্যান্য অভিবাসী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
অভিবাসীদের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশেও ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ নিজেদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন, সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা এবং নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদের বিস্তার ধর্মীয় বৈচিত্র্যের অন্যতম পরিমাপযোগ্য উদাহরণ। ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং (আইএসপিইউ) এবং হার্টফোর্ড ইনস্টিটিউটের পরিচালিত ২০২০ সালের জাতীয় মসজিদ জরিপে দেশজুড়ে ২ হাজার ৭৬৯টি মসজিদ শনাক্ত করা হয়। ২০১০ সালের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১০৬টি। অর্থাৎ এক দশকে মসজিদের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ।
জরিপে মসজিদের অবস্থানেও পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। বড় শহরের কেন্দ্রস্থলের তুলনায় শহরতলি ও নতুন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মসজিদের উপস্থিতি বেড়েছে। এর পেছনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক বিস্তার, নতুন অভিবাসী পরিবার এবং কর্মসংস্থান ও শিক্ষার কারণে মানুষের বসবাসের স্থান পরিবর্তনের মতো বিষয় ভূমিকা রাখছে।
তবে ২০২০ সালের ২ হাজার ৭৬৯টি মসজিদের হিসাবকে ২০২৬ সালের বর্তমান মোট সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য জাতীয় মসজিদ জরিপের হিসাব। পরবর্তী সময়ে নতুন মসজিদ প্রতিষ্ঠা বা কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রকৃত সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে নিয়মিত নামাজের পাশাপাশি শিশুদের কোরআন শিক্ষা, ইসলামিক স্কুল, ধর্মীয় আলোচনা, ঈদ ও অন্যান্য উৎসব, দাতব্য কার্যক্রম এবং সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য এসব প্রতিষ্ঠান নতুন সমাজে পরিচিতি তৈরি, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। অনেক ইসলামিক সেন্টারে বিভিন্ন দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।
হিন্দু মন্দিরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিকাশ লক্ষ করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দু মন্দিরের কোনো একক, পূর্ণাঙ্গ সরকারি জাতীয় তালিকা না থাকায় দেশজুড়ে মন্দিরের সঠিক বর্তমান সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। বেসরকারি বিভিন্ন তথ্যভান্ডারে বিপুলসংখ্যক মন্দিরের তালিকা রয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত সব প্রতিষ্ঠান সক্রিয় কি না কিংবা একই প্রতিষ্ঠান একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। ফলে বেসরকারি তালিকার সংখ্যাকে সরকারি জাতীয় গণনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
হিন্দু মন্দিরগুলোতে পূজা, আরতি, দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, দীপাবলি ও অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি শিশুদের বাংলা, হিন্দি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষা শেখানো, সংগীত, নৃত্য এবং ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিচর্চার আয়োজন করা হয়। নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির মতো এলাকায় মন্দিরকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরতে ভূমিকা রাখছে। মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগগুলোও অনেক ক্ষেত্রে কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩-২৪ সালের রিলিজিয়াস ল্যান্ডস্কেপ স্টাডিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬ হাজার ৯০৮ জন প্রাপ্তবয়স্কের মতামত নেওয়া হয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত গবেষণার ফল অনুযায়ী, দেশটির প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে খ্রিস্টান ছাড়া অন্য ধর্মের অনুসারীর হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০০৭ সালে ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। নতুন জরিপে মুসলিম ১ দশমিক ২ শতাংশ, বৌদ্ধ ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং হিন্দু ০ দশমিক ৯ শতাংশ।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের একই গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে জন্ম নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ১৪ শতাংশ খ্রিস্টান ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারী। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪ শতাংশ মুসলিম, ৪ শতাংশ হিন্দু এবং ৩ শতাংশ বৌদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে খ্রিস্টান ছাড়া অন্য ধর্মের অনুসারীর হার ৬ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অখ্রিস্টান ধর্মীয় পরিচয়ের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের অভিবাসনবিষয়ক আরেক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের ৮৭ শতাংশ কোনো না কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে ৭০ শতাংশ খ্রিস্টান। মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধসহ অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও এই জনগোষ্ঠীর অংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিবর্তনকে শুধু অভিবাসনের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। জন্মহার, প্রজন্মগত পরিবর্তন, ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ বা ত্যাগ এবং মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসও সামগ্রিক ধর্মীয় চিত্রকে প্রভাবিত করে।
নতুন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পুরোনো ভবন ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতি বাড়লে সেখানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের চাহিদাও তৈরি হয়। জমি কিনে নতুন ভবন নির্মাণের ব্যয় বেশি হওয়ায় কোনো কোনো কমিউনিটি আগে থেকে থাকা চার্চ, অফিস, বাড়ি বা বাণিজ্যিক ভবন কিনে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার করে।
এ ধরনের রূপান্তরের মাধ্যমে পুরোনো স্থাপনা নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবহার পায়। তবে সব ভবনকে সরাসরি উপাসনালয়ে রূপান্তর করা যায় না। ভবনের ব্যবহার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্থানীয় জোনিং বিধি, অগ্নিনিরাপত্তা, পার্কিং, প্রবেশগম্যতা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন মেনে চলতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্যও দেখা দেয়। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নগর পরিকল্পনা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিয়ম অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় অনুশীলনের সাংবিধানিক সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মীয় অনুশীলন ও উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার অধিকার পান। তবে ভবন নির্মাণ, জমির ব্যবহার ও স্থানীয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনও মেনে চলতে হয়।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদ, মন্দির, ইসলামিক স্কুল ও অন্যান্য ধর্মীয় কমিউনিটি সেন্টারের বিস্তার দেশটির পরিবর্তনশীল জনসংখ্যা ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি দৃশ্যমান দিক। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু ধর্মীয় আচার পালনের স্থান নয়, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক সহযোগিতা এবং নতুন প্রজন্মের পরিচয় গড়ে তোলার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
অভিবাসনের ধারাবাহিকতা, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিকাশ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলছে। পুরোনো চার্চের পাশাপাশি নতুন মসজিদ, হিন্দু মন্দির, ইসলামিক স্কুল ও বিভিন্ন ধর্মীয় কমিউনিটি সেন্টারের উপস্থিতি সেই পরিবর্তনেরই দৃশ্যমান প্রতিফলন।
তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি ব্যুরো (U.S. Census Bureau), পিউ রিসার্চ সেন্টার (Pew Research Center), ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ISPU), হার্টফোর্ড ইনস্টিটিউট, পরিচয়।



















