Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   নিউইয়র্কে মঞ্চস্থ ‘বহ্নিশিখা দ্য ফ্লেম’: রাজা রামমোহন রায়ের জীবন, সতীদাহ প্রথা রদ ও বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস উঠে এলো মঞ্চে

নিউইয়র্কে মঞ্চস্থ ‘বহ্নিশিখা দ্য ফ্লেম’: রাজা রামমোহন রায়ের জীবন, সতীদাহ প্রথা রদ ও বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস উঠে এলো মঞ্চে

নিউইয়র্কে মঞ্চস্থ ‘বহ্নিশিখা দ্য ফ্লেম’: রাজা রামমোহন রায়ের জীবন, সতীদাহ প্রথা রদ ও বাংলার নবজাগরণের ইতিহাস উঠে এলো মঞ্চে

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক । উত্তম কুমার সাহা । নিউইয়র্ক:

রাজা রামমোহন রায়ের জীবন, সতীদাহ প্রথা বিলোপের ঐতিহাসিক সংগ্রাম এবং বাংলার নবজাগরণের চেতনা নিয়ে নির্মিত নাটক ‘বহ্নিশিখা দ্য ফ্লেম’ নিউইয়র্কে মঞ্চস্থ হয়েছে। ইতিহাস, সমাজ সংস্কার, মানবিক মূল্যবোধ ও যুক্তিবাদী চেতনার বার্তায় সমৃদ্ধ এ নাটক দর্শকদের সামনে তুলে ধরে বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের জীবন ও কর্মের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

গত ২৯ আগস্ট ২০২৬, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে নিউইয়র্কের Jamaica Performing Arts Center (JPAC)-এ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। Cultural Creation Maryland-এর পরিবেশনায় আয়োজিত এ নাটকে রামমোহন রায়ের সমাজ সংস্কারের আন্দোলন, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান এবং বিশেষ করে অমানবিক সতীদাহ প্রথা বিলোপে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা নাট্যরূপে তুলে ধরা হয়।

নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার সময় পুরো অডিটোরিয়াম দর্শকে পরিপূর্ণ ছিল। লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, নাট্যব্যক্তিত্বসহ নিউইয়র্কের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে নাটকটি উপভোগ করেন। নাটকের বিষয়বস্তু, অভিনয়, সংলাপ, মঞ্চ পরিকল্পনা ও সঙ্গীত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।

‘বহ্নিশিখা দ্য ফ্লেম’ শুধু একজন সমাজ সংস্কারকের জীবনকাহিনি নয়; এটি বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শিল্পিত উপস্থাপন। অন্ধকার, কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে জ্ঞান, যুক্তি, মানবতা ও সংস্কারের যে আলোকশিখা রাজা রামমোহন রায় প্রজ্বলিত করেছিলেন, নাটকটির মধ্য দিয়ে সেই চেতনাকেই প্রবাসের নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

ঊনবিংশ শতকের বাংলায় সমাজ সংস্কারের যে আন্দোলন নতুন চিন্তা ও আধুনিকতার দ্বার উন্মোচন করেছিল, রাজা রামমোহন রায় ছিলেন তার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান, সতীদাহ প্রথা বিলোপের দাবি, শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরোধিতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসারে তাঁর ভূমিকা বাংলা সমাজের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। নাটকটিতে তাঁর সেই সংগ্রামী জীবন ও মানবতাবাদী দর্শনকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

নাটকের বিভিন্ন দৃশ্য, সংলাপ, অভিনয়, আবহসংগীত ও মঞ্চ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তৎকালীন বাংলার সামাজিক বাস্তবতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তোলা হয়। বিশেষ করে সতীদাহ প্রথার ভয়াবহতা এবং এর বিরুদ্ধে রামমোহন রায়ের প্রতিবাদ নাটকের আবেগঘন অংশ হিসেবে দর্শকদের মধ্যে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

নাটকটির রচনা ও পরিচালনা করেছেন অনুতোষ সাহা। শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন দেবাঞ্জন বিশ্বাস। কণ্ঠশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন শৌনক চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইতিহাসভিত্তিক বিষয়টি নাট্যরূপে দর্শকদের সামনে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

প্রবাসের মাটিতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা যখন নতুন প্রজন্মের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ইতিহাস ও সমাজ সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তুলে ধরার এ উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আয়োজকদের মতে, অতীতের ইতিহাস শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়, সেই ইতিহাস থেকে মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার শিক্ষা গ্রহণ করাও জরুরি।

নাটক শেষে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে আয়োজক ও নাট্যকার-পরিচালক অনুতোষ সাহা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, যারা উপস্থিত হয়ে নাটকটি উপভোগ করেছেন এবং নাটকটি উপস্থাপনে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের সবার প্রতি তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।

তিনি বলেন, প্রবাসে থেকেও বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজ সংস্কারের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এই প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। দর্শকদের ভালোবাসা ও সহযোগিতাই ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজন করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।

‘বহ্নিশিখা দ্য ফ্লেম’-এর মধ্য দিয়ে নিউইয়র্কের মঞ্চে যেন আবারও উচ্চারিত হলো জ্ঞান, যুক্তি, মানবতা ও সামাজিক সংস্কারের সেই চিরন্তন আহ্বান। রাজা রামমোহন রায়ের প্রজ্বলিত সেই বহ্নিশিখা আজও যে সমাজকে আলোকিত করার শক্তি রাখে—নাটকটি সেই বার্তাই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

ছবি: উত্তম কুমার সাহা, প্রজ্ঞা নিউজ।