আবারও দখলে জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজা ও ফুটপাত: উচ্ছেদের পরও ফিরেছে অবৈধ দোকান, ডাবল পার্কিং ও বিশৃঙ্খলা—প্রশ্ন উঠছে নজরদারি ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
নিউইয়র্কের অন্যতম ব্যস্ত বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজা ও সংলগ্ন ফুটপাত আবারও অবৈধ ব্যবসা ও অস্থায়ী স্থাপনার দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফুটপাতের ওপর দোকান বসানো, মালামাল ও কার্টন রেখে পথ সংকুচিত করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ডাবল পার্কিং এবং রাস্তায় আবর্জনা ফেলার কারণে প্রতিদিন চরম দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারীরা। একই সঙ্গে যানজট, অতিরিক্ত হর্ন, উচ্চস্বরে বাকবিতণ্ডা এবং বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনায় এলাকার পরিবেশ ও ভাবমূর্তি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
চলতি বছরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ডাইভারসিটি প্লাজা ও আশপাশের ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়েছিল। সে সময় ফুটপাত থেকে বেশ কিছু অস্থায়ী দোকান ও ব্যবসা সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তিন মাস না পেরোতেই আগের চিত্র আবারও ফিরে এসেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অভিযোগ।
সম্প্রতি জ্যাকসন হাইটসের বিভিন্ন ব্যবসায়ী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনের ফুটপাতের বড় অংশ বিভিন্ন পণ্য, কার্টন, মালামাল ও অস্থায়ী স্থাপনায় আটকে রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও ফুটপাতের ওপর বসানো হয়েছে অস্থায়ী দোকান। ফলে পথচারীদের মূল সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
প্রজ্ঞা নিউজের প্রতিনিধি সংবাদ সংগ্রহের জন্য জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজা এলাকায় গেলে সেখানে ফুটপাতে দোকান বসানো নিয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ীর মধ্যে প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা দেখতে পান। দোকান বসানোর জায়গা নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে পথচারীদের চলাচলের পথও বাধাগ্রস্ত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, প্রকাশ্য স্থানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।
জ্যাকসন হাইটসের সমস্যা শুধু ফুটপাত দখলেই সীমাবদ্ধ নয়। মূল সড়ক ও আশপাশের রাস্তায় নিয়ম না মেনে গাড়ি দাঁড় করানো, ডাবল পার্কিং এবং মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির কারণে দিনের ব্যস্ত সময়ে যানজট আরও তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে শনিবার ও রোববার জ্যাকসন হাইটসে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসায় পরিস্থিতি অনেক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
একদিকে ফুটপাত ব্যবসায়ীদের দখলে, অন্যদিকে রাস্তার পাশে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে পথচারীদের চলাচলের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে পথচারী ও যানবাহন উভয়ের চলাচলেই তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। অনেক সময় গাড়ির অতিরিক্ত হর্ন, ট্রাফিক জ্যাম, উচ্চস্বরে কথাবার্তা ও বাকবিতণ্ডায় এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশও বিঘ্নিত হচ্ছে।
এলাকায় দেশীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, সভা ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের সময়ও যান চলাচল ও পথচারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক মতবিরোধকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যে উত্তেজনা, বাকবিতণ্ডা, হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য ও কমিউনিটি নেতা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, জ্যাকসন হাইটস আমেরিকায় বাংলাদেশিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় স্থানগুলোর একটি। এখানে মানুষের চলাফেরা, বিভিন্ন ধরনের দোকান ও রেস্টুরেন্ট এবং রাতদিন মানুষের আনাগোনা রয়েছে। তাই এখনই জ্যাকসন হাইটসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ফুটপাত দোকানমুক্ত রাখা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, রাস্তার পাশে পথচারীদের বসার ব্যবস্থা, অপ্রয়োজনীয় হর্ন নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগ, দুর্গন্ধ ও ময়লা-আবর্জনা নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা, প্রকাশ্যে মদ্যপান ও গাঁজা সেবন বন্ধে ব্যবস্থা, অস্ত্র বহন মুক্ত এলাকা সাইনবোর্ড লাগানো এবং রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে ফুটপাত ও সড়কে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া বর্জ্য, মালামালের কার্টন ও অন্যান্য আবর্জনা অনেক সময় ফুটপাতের পাশে কিংবা রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে অভিযোগ। এতে পথচারীদের চলাচলে যেমন সমস্যা হচ্ছে, তেমনি দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে।
এছাড়া যেখানে-সেখানে পানের পিক, সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলার কারণে এলাকার সৌন্দর্য ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ডাইভারসিটি প্লাজা ও আশপাশে প্রকাশ্যে বিয়ার - গাজা সেবন , উচ্চস্বরে বাকবিতণ্ডা এবং মাঝেমধ্যে মারামারির ঘটনাও স্থানীয়দের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন পথচারী অভিযোগ করে বলেন, জ্যাকসন হাইটসে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বকারী একাধিক সংগঠন থাকলেও ফুটপাত দখল, পার্কিং ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে তাদের কার্যকর ভূমিকা খুব বেশি চোখে পড়ে না। তার অভিযোগ, ব্যবসায়ী সংগঠনের কিছু নেতাকেও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করতে দেখা যায়। অথচ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশে তারাই ব্যবসায়িক নীতি ও সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে বড় বড় কথা বলেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। কারণ কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়াই সাংবাদিকতার নীতি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই আবার একই জায়গায় দোকান বসে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু অভিযান চালিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করলেই কি সমস্যার সমাধান সম্ভব, নাকি প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা?
সচেতন নাগরিকদের মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যারা নিয়ম ভঙ্গ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সচেতন করতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশি বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন অব নিউইয়র্কের সাধারণ সম্পাদক ফাহাদ সোলায়মান বলেন, কুইন্সের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশিরা মিলেমিশে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাদের নানা সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে একজনের প্রতি অন্যজনের সম্মান প্রদর্শনের অভাবও একটি সমস্যা। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে শিগগিরই বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
জ্যাকসন হাইটস এলাকাবাসী ইনক এর সভাপতি সাকিল মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক মো : আলম নমী বলেন, খুব শিগগির ব্যবসায়ী সংগঠন ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে এ বিষয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হবে। আলোচনার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সমস্যাগুলোর সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, জ্যাকসন হাইটসে বছরজুড়ে অসংখ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ডোনেশন সংগ্রহ, ব্যানার-পোস্টারে ব্যক্তির নাম ও পদ প্রদর্শন এবং সংগঠকদের পরিচিতি তুলে ধরার প্রবণতা থাকলেও জ্যাকসন হাইটসকে দীর্ঘমেয়াদে একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও সুন্দর এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।
তাদের প্রশ্ন, ব্যক্তিগত পরিচিতি, পদ-পদবি ও সংগঠনের প্রচারের পাশাপাশি জ্যাকসন হাইটসের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে কতটা কাজ হচ্ছে? ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, ময়লা-আবর্জনা নিয়ন্ত্রণ, যানজট কমানো, পার্কিং ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য কেন দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে না?
জ্যাকসন হাইটসকে অনেকেই ‘লিটল বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত করেন। বাংলাদেশি ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মানুষের আনাগোনায় এলাকাটি নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতিদিন শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, বিভিন্ন দেশের মানুষও এই এলাকায় আসেন। ফলে এখানকার পরিবেশ ও শৃঙ্খলা পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত।
একজন সচেতন নাগরিক বলেন, ফুটপাত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা। ব্যবসা অবশ্যই হবে, কিন্তু সেই ব্যবসা পরিচালনার কারণে মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ব্যবসায়ী, নাগরিক ও সংগঠনগুলো নিজেদের দায়িত্ব বুঝে এগিয়ে এলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
সচেতন নাগরিকদের মতে, জ্যাকসন হাইটসকে সুন্দর রাখতে শুধু সিটি কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েক দিনের জন্য ফুটপাত দখলমুক্ত করে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চক্র বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, ব্যবসায়ীদের সচেতনতা এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা।
এখন জ্যাকসন হাইটসের বাসিন্দা ও পথচারীদের একটাই প্রশ্ন—উচ্ছেদের পর বারবার যদি ফুটপাত আবার দখল হয়ে যায়, তাহলে স্থায়ীভাবে এই দখলদারিত্ব বন্ধ হবে কবে? আর ‘লিটল বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত জ্যাকসন হাইটসকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও পথচারীবান্ধব করে গড়ে তোলার দায়িত্বই বা নেবে কে?



















