প্রবাসে সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও ভালোবাসার মহামিলন—নিউইয়র্কে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের ব্যতিক্রমী চড়ুইভাতি; তিন শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণে রচিত হলো এক স্মরণীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাস
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক:
প্রবাসে বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সম্প্রীতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও মানবিক মূল্যবোধকে নতুন উচ্চতায় তুলে ধরল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদ। কেবল একটি বনভোজন নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাঙালিয়ানা, সাংস্কৃতিক চেতনা, সৌহার্দ্য ও পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার এক অনন্য উদ্যোগ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকল সংগঠনটির দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য চড়ুইভাতি।
গত ২৮ জুন ২০২৬, রবিবার নিউইয়র্কের Franklin D. Roosevelt State Park-এ সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে প্রায় তিন শতাধিক সদস্য, শুভানুধ্যায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, কমিউনিটি নেতা, নারী, পুরুষ, শিশু ও নতুন প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো পার্ক পরিণত হয় এক টুকরো বাংলাদেশে। দিনভর হাসি-আনন্দ, গান, নৃত্য, খেলাধুলা, দেশীয় খাবার ও আন্তরিক আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয় এক প্রাণবন্ত, উৎসবমুখর ও হৃদয়স্পর্শী পরিবেশ।
চড়ুইভাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক পরিকল্পনার চমৎকার সমন্বয়। পার্কেই সকালের নাস্তা তৈরির উৎসবমুখর পরিবেশ, ডা. আজিজুল হকের নেতৃত্বে ভাত, পোলাও ও খাসির মাংস রান্না, বারবিকিউ, এস্টোরিয়ার জনপ্রিয় বৈশাখী রেস্টুরেন্টের সুস্বাদু মধ্যাহ্নভোজ, কাঁঠাল, আম, আম ভর্তা, দেশীয় পিঠা, তাজা ফল, ক্যান্ডি এবং নানা রকমের খাবারের সমারোহ অংশগ্রহণকারীদের মুগ্ধ করে। দিনব্যাপী আপ্যায়নে ছিল আন্তরিকতার ছাপ, যা অতিথিদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী আকর্ষণ ছিল উদীচী পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্য প্রজ্ঞাত্তম সাহা প্রজ্ঞার পরিকল্পনায় উদীচী পিঠা কর্নার, উদীচী ফল কর্নার এবং উদীচী ক্যান্ডি কর্নার। বাংলার ঐতিহ্য, স্বাদ ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে এই উদ্যোগ উপস্থিত সকলের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। ছোট-বড় সবাই আনন্দের সঙ্গে পিঠা, ফল ও ক্যান্ডি উপভোগ করেন। প্রতিটি পরিবারের হাতে উদীচীর মনোগ্রামসংবলিত কাপ ও টি-শার্ট তুলে দেওয়া হয়, যা অনুষ্ঠানের স্মারক হিসেবে বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
শিশুদের জন্য ছিল বিস্কুট দৌড়, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পরিবারভিত্তিক আনন্দঘন খেলাধুলা।
নারীদের বল নিক্ষেপ প্রতিযোগিতায় ছিল ব্যাপক উৎসাহ। অন্যদিকে উদীচীর শিল্পীদের পরিবেশিত দেশাত্মবোধক, গণসংগীত ও জনপ্রিয় বাংলা গানের সঙ্গে অতিথিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে এক অনন্য সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কল্লোল দাশ সারাদিন উপস্থিত থেকে প্রতিটি অতিথি, সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীর খোঁজখবর নেন এবং ব্যক্তিগতভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তাঁর আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও নিবেদিত তদারকি অংশগ্রহণকারীদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
চড়ুইভাতিতে অংশ নিয়ে Weekly Generation পত্রিকার সম্পাদক শাহ্ জে. চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন— “স্মৃতির ক্যানভাসে এক টুকরো আনন্দ: উদীচীর আঙিনায় এক অনবদ্য দিন।” তিনি বলেন, এমন হৃদয়গ্রাহী, সুশৃঙ্খল ও নিখুঁত আয়োজন খুব কমই দেখা যায়। প্রকৃতির স্নিগ্ধ পরিবেশ, প্রাণবন্ত আড্ডা, মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সুস্বাদু খাবার এবং আয়োজকদের নিখাদ আন্তরিকতা তাঁকে ও তাঁর সহধর্মিণীকে গভীরভাবে আপ্লুত করেছে।
Shah Group-এর কো-ফাউন্ডার Husneara Choudhury বলেন, তিনি বহু বনভোজনে অংশ নিলেও উদীচীর মতো আন্তরিক, সুশৃঙ্খল এবং সৃজনশীল আয়োজন খুব কমই দেখেছেন। বিশেষ করে পিঠা কর্নার, ফল কর্নার ও ক্যান্ডি কর্নারের মতো অভিনব উদ্যোগ অনুষ্ঠানটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
চড়ুইভাতি আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মিনহাজ আহমেদ এবং সদস্য সচিব মুনমুন সাহা বলেন, এই আয়োজন সফল করার পেছনে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, এটি শুধু একটি বনভোজন নয়; এটি ছিল প্রবাসে বাঙালির ঐক্য, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনার এক উজ্জ্বল উৎসব।
আয়োজকরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান কমিউনিটির লিডার ও FAUMA INNOVATIVE
C O N S U L T A N C Y G R O U P এর সিইও ফাহাদ সোলাইমান, ওবায়দুল মামুন, ফোবানা-এর সেন্ট্রাল কমিটির চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী, বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান সভাপতি ও বাংলাদেশ সোসাইটির আগামী নির্বাচনে আবারও সভাপতি প্রার্থী আতাউর রহমান সেলিম, সিআইপি মোহাম্মদ কাদের, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজল মাহমুদ, বাংলাদেশ সোসাইটির সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী দুলাল বেহেদু, কমিউনিটি লিডার মোহাম্মদ আমিনুল, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নিউটন দাস, CDL লাইসেন্স প্রশিক্ষক মনিরুজ্জামান খান, ফটোসাংবাদিক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তাপস সাহা, Law Office H. Bruce Fischer Esq. P.C.-এর Queens Office Manager Zeenat Zavin, SS Brokerage-এর শ্যামল সরকার, অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী, J. K. Gain Multiservices ও J. K. Gain Insurance Agency-এর সিইও জয়দেব গাইন, সাতক্ষীরা জেলা সমিতির সহ-সভাপতি দেবব্রত ঘোষসহ সকল সহযোগীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এছাড়া চড়ুইভাতির সফল বাস্তবায়নে বিভিন্ন উপপরিষদের সদস্যরা দিনভর নিরলস পরিশ্রম করেন। সুপরিকল্পিত দায়িত্ব বণ্টন, আন্তরিকতা, দলগত সমন্বয় এবং অক্লান্ত শ্রমের ফলেই পুরো আয়োজন সুশৃঙ্খল, প্রাণবন্ত ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
আপ্যায়ন উপপরিষদে ছিলেন শুভ্রা নন্দী, ফাহমিদা লুনা, উর্মি সাহা, ফুলু রায় চৌধুরী ও শাহানা নুপুর। অতিথিদের আন্তরিক অভ্যর্থনা এবং সারাদিনের খাবার পরিবেশন ও তত্ত্বাবধানে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অর্থ উপপরিষদে দায়িত্ব পালন করেন সুমন দে, সুপর্ণা সরকার রিমা, জুলি খাস্তগীর ও সুচরিত দত্ত। সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ে তাঁদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
অভ্যর্থনা উপপরিষদে ছিলেন বাবুল আচার্য, জাকির হোসেন বাচ্চু, ডা. আজিজুল হক, আশীষ রায় ও কল্লোল দাশ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগত অতিথিদের অভ্যর্থনা, দিকনির্দেশনা ও সার্বিক সহযোগিতায় তাঁরা আন্তরিকতার পরিচয় দেন।
সাংস্কৃতিক উপপরিষদে দায়িত্ব পালন করেন সুলেখা পাল, লিলি মজুমদার, ইমন বিশ্বাস ও পিংকি বানিয়া। তাঁদের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে সারাদিনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আরও প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
প্রচার উপপরিষদে ছিলেন উত্তম সাহা, হিরো চৌধুরী, সুপ্রিয়া চৌধুরী, বদরুল চৌধুরী ও মুমানিক মূল্য। অনুষ্ঠান প্রচার, সংবাদ পরিবেশন, আলোকচিত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয়োজনটি ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
র্যাফেল ড্র পরিচালনায় ছিলেন ফুলু রায় চৌধুরী, শ্রাবণী কর্মকার, কাবির হোসেন ও ত্রিপর্ণা দে। তাঁদের দক্ষ পরিচালনায় র্যাফেল ড্র পর্বটি উপস্থিত সবার মধ্যে বাড়তি আনন্দ ও উৎসাহ সৃষ্টি করে।
ক্রীড়া উপপরিষদে ছিলেন দীপু দাস , ফারজানা রুমা, স্নিগ্ধা আচার্য, দিলীপ মোদক ও অমিত বানিয়া। শিশু, নারী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য আয়োজিত বিভিন্ন ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা সফলভাবে পরিচালনা করে তাঁরা অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন।
অনুষ্ঠান শেষে অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী টেলিফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সরাসরি উপস্থিত হয়ে আয়োজকদের আন্তরিকতা, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ এবং নিঃস্বার্থ আতিথেয়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন। অনেকেই মন্তব্য করেন, প্রবাসে এ ধরনের আয়োজন শুধু একটি বনভোজন নয়; এটি নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়ার এক কার্যকর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ব্যস্ত প্রবাসজীবনের ক্লান্তি, কর্মব্যস্ততা ও সামাজিক দূরত্বের মাঝেও এমন একটি দিন সবাইকে আবারও এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। প্রবীণ ও নবীন, নারী ও পুরুষ, শিশু ও কিশোর—সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। ফলে এটি শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি পরিবারের মতো একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করেছে।
চড়ুইভাতির আয়োজকরা জানান, উদীচী সবসময়ই সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে প্রবাসে কাজ করে যাচ্ছে। এই চড়ুইভাতিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ, যেখানে আনন্দের পাশাপাশি মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আয়োজকদের ভাষায়, ব্যস্ত প্রবাসজীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যদি সবাই ভালোবাসা, সংস্কৃতি, মানবিকতা ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারে, তবে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও আলোকিত কমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব। এই চড়ুইভাতি সেই বিশ্বাসকেই আরও সুসংহত করেছে।
সবশেষে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র সংসদের পক্ষ থেকে সকল সদস্য, শুভানুধ্যায়ী, অতিথি, স্বেচ্ছাসেবক, উপপরিষদের সদস্য, সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত শুভেচ্ছা জানানো হয়। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উদীচী আগামী দিনেও প্রবাসে বাঙালির ঐতিহ্য, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ এবং মানবিক সমাজ গঠনের অগ্রযাত্রায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে।



















