Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   মানুষের ভালোবাসায় অমর শ্রী রানা দাস: নিউইয়র্কে অশ্রুসিক্ত বিদায়, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ শ্রদ্ধায় মানুষের ঢল; সন্তানদের আবেগঘন বক্তব্যে ভারী হয়ে ওঠে স্মরণসভা

মানুষের ভালোবাসায় অমর শ্রী রানা দাস: নিউইয়র্কে অশ্রুসিক্ত বিদায়, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ শ্রদ্ধায় মানুষের ঢল; সন্তানদের আবেগঘন বক্তব্যে ভারী হয়ে ওঠে স্মরণসভা

মানুষের ভালোবাসায় অমর শ্রী রানা দাস: নিউইয়র্কে অশ্রুসিক্ত বিদায়, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ শ্রদ্ধায় মানুষের ঢল; সন্তানদের আবেগঘন বক্তব্যে ভারী হয়ে ওঠে স্মরণসভা

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, কোনো খ্যাতিমান তারকাও নন। তবুও তাঁর বিদায়ে যেন স্তব্ধ হয়ে যায় নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি। কারণ, শ্রী রানা দাসের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ মানবিক মানুষ, যিনি ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও বিনয়ের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছিলেন।
ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম শেষে মাত্র ৫৭ বছর বয়সে গত ২৭ জুন নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শ্রী রানা দাস। তাঁর মৃত্যুতে প্রবাসী সমাজে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।


পরিবারের আয়োজনে উডসাইডের গুলশান টেরেসে অনুষ্ঠিত স্মরণসভা পরিণত হয় এক ব্যতিক্রমী মানবিক মিলনমেলায়। ফুলে ফুলে সজ্জিত কফিনের পাশে রাখা ছিল তাঁর চিরচেনা হাসিমাখা প্রতিকৃতি। সেই হাসিময় মুখের দিকে তাকিয়ে উপস্থিত অনেকেই অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি।
স্মরণসভার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল প্রয়াত রানা দাসের দুই সন্তানের বক্তব্য। বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছেলে অঙ্গন দাস বলেন, “বাবার পরিচয়ই আমার একমাত্র পরিচয়। এই পরিচয় নিয়েই আমি বাকি জীবন আপনাদের মাঝে থাকতে চাই।” তাঁর এই কথায় মুহূর্তেই নীরবতায় ঢেকে যায় পুরো হলঘর।


মেয়ে রেহা দাস স্মৃতিচারণ, গান এবং অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, “আপনারা যেমন বাবার পাশে ছিলেন, তেমনি আমাদের পাশেও থাকবেন। বাবা আমাদের শিখিয়ে গেছেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা। সেই শিক্ষা যেন আমরা ধরে রাখতে পারি।”
গভীর শোকে বাকরুদ্ধ স্ত্রী কল্পনা দাস পরিবারের পক্ষ থেকে উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
স্মরণসভায় শুধু বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরাই নন, উপস্থিত ছিলেন রানা দাসের প্রতিবেশী, সহকর্মী এবং বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ। তাঁর শ্বেতাঙ্গ প্রতিবেশী জেসি আবেগঘন স্মৃতিচারণ করে বলেন, “রানা আমাকে বাংলা শেখাতে গিয়ে বলতেন—‘আমরা পরিবার।’ আজ বুঝতে পারছি, তাঁর পরিবার শুধু আত্মীয়স্বজন নয়, ভালোবাসায় গড়ে ওঠা অসংখ্য মানুষ।”
ধর্ম, বর্ণ কিংবা জাতিগত বিভেদ ভুলে শত শত মানুষ ফুল হাতে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। কেউ নীরবে প্রার্থনা করেছেন, কেউ কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছেন। উপস্থিত অনেকেই মন্তব্য করেন, নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এমন হৃদয়স্পর্শী ও সর্বজনীন স্মরণসভা বিরল।


অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কানাডা থেকে আগত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শক্তিব্রত হালদার মানু। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন জুয়েল চৌধুরী, জয় দে, কান্তি দাস, ঝিলম চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। স্মৃতিচারণে অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, সিলেটের বনেদি পরিবারের সন্তান হয়েও রানা দাস ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নিরহংকারী। মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সম্পর্ককে আপন করে নেওয়া এবং নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা বিলিয়েই তিনি নিজেকে সবার কাছে প্রিয় করে তুলেছিলেন।
পরিবারের নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, কোরোনার কপোলা মিগলিওরে ফিউনারেল চ্যাপেলে ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠানের পর ইস্ট এলমহার্স্টের অল সোলস চ্যাপেল অ্যান্ড ক্রিমেটরিতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।


শ্রী রানা দাসের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোকের ছায়া নেমে আসে। অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী তাঁর মানবিকতা, উদারতা ও সহৃদয়তার স্মৃতি তুলে ধরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে শোকবার্তা, ফুল এবং উপস্থিতির মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশকারী সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
এদিকে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাঙালী পত্রিকার সম্পাদক কৌশিক আহমেদ, সাপ্তাহিক জন্মভূমি-র সম্পাদক রতন তালুকদার এবং সাপ্তাহিক প্রথম আলো-র সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন , এটিএন বাংলা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি কানু দত্ত, প্রজ্ঞা নিউজের সম্পাদক ও প্রকাশক উত্তম কুমার সাহা পৃথক শোকবার্তায় শ্রী রানা দাসের অকাল প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তাঁরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।

শ্রী রানা দাসের জীবন হয়তো দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু তাঁর মানবিকতা, বিনয় এবং মানুষকে ভালোবাসার যে অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মানুষের হৃদয়ে যে ভালোবাসার আলো তিনি জ্বালিয়ে গেছেন, সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
সূত্র: সাপ্তাহিক বাঙালী , ছবি - বিধান পাল