প্রবাসে ‘মন মাঝে পঞ্চ কবি’—রবীন্দ্র একাডেমি অব ইউএসএ-এর ব্যতিক্রমী আয়োজনে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অনন্য উৎসব, জীবন চৌধুরী পেলেন লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মাননা
প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল রবীন্দ্র একাডেমি অব ইউএসএ। সংগঠনটির উদ্যোগে গত ৭ জুন ২০২৬ রোববার উডসাইডের কুইন্স প্যালেসে অনুষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রমী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘প্রবাসে মন মাঝে পঞ্চ কবি’। বিকেল ৩টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলা এই বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নৃত্যের সমন্বয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।
বাংলা সাহিত্যের পাঁচ মহীরুহ—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বীজেন্দ্রলাল রায় , অতুল প্রসাদ সেন ও রজনীকান্ত সেন, সাহিত্য ও দর্শনকে প্রবাসে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই ছিল অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি এবং শেকড়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার বার্তা ছিল পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। এরপর রবীন্দ্র একাডেমি অব ইউএসএ-এর সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রুমা চৌধুরী স্বাগত বক্তব্যে উপস্থিত সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চা অব্যাহত রাখতে এবং আগামী প্রজন্মের হাতে সেই ঐতিহ্য তুলে দিতে রবীন্দ্র একাডেমি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে বক্তারা রবীন্দ্র একাডেমির কার্যক্রম এবং রুমা চৌধুরীর সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ প্রবাসে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশিষ্ট লেখক, কবি, গীতিকার ও নাট্যকার জীবন চৌধুরীকে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান। দীর্ঘদিনের সাহিত্য সাধনা, সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মাননা গ্রহণের সময় উপস্থিত দর্শকদের করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো হলরুম।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ডা. প্রভাত দাস, খান’স টিউটোরিয়ালের চেয়ার ডা. নায়িমা খান, আরটিভি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক রহমান, ডেমোক্র্যাটিক ডিস্ট্রিক্ট লিডার ও কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট ডা. দিলীপ নাথ এবং সিতাংশু গুহ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. উৎপল চৌধুরী, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট রীনা সাহা, ব্যবসায়ী সুমি রায় এবং প্রজ্ঞা নিউজের সম্পাদক ও প্রকাশক উত্তম কুমার সাহাসহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সাংস্কৃতিক পর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্য ও জসীমউদ্দীনের কালজয়ী কবিতা, গান ও দর্শনের আলোকে পরিবেশিত হয় আবৃত্তি, একক ও দলীয় সঙ্গীত, নৃত্য এবং নৃত্যনাট্য। বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুলগীতি দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাদের অনুরাগের উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটায়।
অনুষ্ঠানজুড়ে পঞ্চ কবির সাহিত্য, দর্শন ও মানবিক চেতনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। কবিদের সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে প্রেম, দেশপ্রেম, সাম্য, মানবতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের বার্তা নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা হয়, যা অনুষ্ঠানে এক ভিন্নমাত্রা যোগ করে। পাশাপাশি ছিল পঞ্চ কবিকে নিয়ে আলোচনা, স্মৃতিচারণ এবং তাঁদের সৃষ্টিকর্মের তাৎপর্য নিয়ে মনোজ্ঞ উপস্থাপনা।
রবীন্দ্র একাডেমি অব ইউএসএ-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রুমা চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দীপক দাসের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। কনভেনর সুশীল সিনহা, প্রধান উপদেষ্টা ডা. সবিতা দাস, সমন্বয়ক স্বপন দত্ত, সহ-কনভেনর পারিজাত দাস, অর্থ সম্পাদক গণেশ ভৌমিক, সাংস্কৃতিক সম্পাদক রুনা রায় ও সামসুন নাহার মিলি, সাংগঠনিক সম্পাদক অরুণা সাহা ও রত্না দাস, সাহিত্য সম্পাদক সুমিত্রা সেন ও শিখা রানী ঠাকুর, যুব সাংস্কৃতিক সম্পাদক ঋত্বিকা ব্যানার্জী এবং যুব সমন্বয়ক শুভজিৎ রায় চৌধুরীসহ আয়োজক কমিটির সদস্যরা অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথি ও দর্শনার্থীদের জন্য নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। উপস্থিত অতিথিরা বলেন, প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজন করা সময়ের দাবি।
‘প্রবাসে মন মাঝে পঞ্চ কবি’ কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল বাংলা সাহিত্য, সৃজনশীলতা, বাঙালিয়ানা ও শেকড়ের প্রতি প্রবাসী সমাজের গভীর ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। প্রবাসের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতির এই মহোৎসব নতুন প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তিও নির্মাণ করেছে।



















