Logo

ইউএসএ নিউজ    >>   তিনটি কোরআন ছুঁয়ে শপথ—প্রতীক, ইতিহাস ও বহুত্ববাদের ঘোষণা: বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক শপথ

তিনটি কোরআন ছুঁয়ে শপথ—প্রতীক, ইতিহাস ও বহুত্ববাদের ঘোষণা: বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক শপথ

তিনটি কোরআন ছুঁয়ে শপথ—প্রতীক, ইতিহাস ও বহুত্ববাদের ঘোষণা: বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক শপথ

প্রজ্ঞা নিউজ ডেস্ক :
নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত রচিত হলো বৃহস্পতিবার। পবিত্র কোরান শরিফ সাক্ষী রেখে নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে শপথ নিলেন জোহরান মামদানি। তবে এই শপথগ্রহণকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল—তিনি একটি নয়, তিনটি কোরান ছুঁয়ে শপথ নেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল পূর্বপরিকল্পিত, প্রতীকী এবং রাজনৈতিকভাবে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্বের রাজধানী হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্কের একটি পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে ব্যক্তিগত পরিসরে অনুষ্ঠিত এই শপথগ্রহণে ব্যবহৃত তিনটি কোরানের প্রত্যেকটিরই ছিল আলাদা ইতিহাস ও বার্তা। মামদানির ব্যবহৃত কোরানগুলোর একটি ছিল তাঁর দাদার ব্যক্তিগত কোরান, যা পারিবারিক বিশ্বাস ও উত্তরাধিকারকে প্রতিনিধিত্ব করে। আরেকটি ছিল নিউইয়র্কের বহুত্ববাদী ইতিহাসের প্রতীক হিসেবে পরিচিত শোমবার্গ কোরান। তৃতীয়টি ছিল একটি সাধারণ কোরান, যা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সার্বজনিকতা ও সর্বজনগ্রাহ্যতাকে নির্দেশ করে।

ছবি: সংগৃহীত
এই তিনটি কোরান ব্যবহার ছিল মামদানির টিমের একটি সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত—যার লক্ষ্য ছিল শপথগ্রহণকে ঘিরে সম্ভাব্য বিতর্ক এড়ানো এবং একইসঙ্গে নিউইয়র্ক শহরের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অভিবাসী উত্তরাধিকারকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
বিশেষভাবে আলোচিত শোমবার্গ কোরানটি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির শোমবার্গ সেন্টারের সংগ্রহভুক্ত। নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের কিউরেটর হিবা আবিদ–এর সহায়তায় মামদানির উপদেষ্টা জারা রহিম এবং তাঁর স্ত্রী রমা দুয়াজি এই ঐতিহাসিক কোরানটির সন্ধান পান।
এই কোরানটি সংগ্রহ করেছিলেন বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাসবিদ ও লেখক আর্তুরো শোমবার্গ। যদিও শোমবার্গ নিজে মুসলিম ছিলেন না—তিনি পুয়ের্তো রিকোতে জন্মগ্রহণ করেন, ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে এপিসকোপাল চার্চের সদস্য হন—তবুও আফ্রিকান ও বিশ্ব ইতিহাসে গভীর আগ্রহ থেকে তিনি কোরানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন।
লাইব্রেরির তথ্যমতে, শোমবার্গ কোরানটি কালো ও লাল কালি দিয়ে লেখা, নকশায় অত্যন্ত সাধারণ—যা ইঙ্গিত করে এটি দৈনন্দিন পাঠের জন্য ব্যবহৃত হতো। লিপি ও বাঁধাই বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, কোরানটি উনিশ শতকের অটোমান সিরিয়ায় প্রস্তুত।
ব্যক্তিগত শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় একটি পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে—যা নিউইয়র্কের শ্রমজীবী মানুষ, অভিবাসী ইতিহাস ও নগর উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত। পরবর্তী জনসমক্ষে আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণের সময় মামদানি তাঁর দাদা-দাদির কোরান ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন।
নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির প্রেসিডেন্ট ও সিইও অ্যান্থনি ডব্লিউ. মার্ক্স এক বিবৃতিতে জানান, এই শপথগ্রহণ নিউইয়র্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এবং লাইব্রেরির সংগ্রহভুক্ত কোরান ব্যবহৃত হওয়াকে তারা সম্মানের চোখেই দেখছেন। তিনি জানান, আগামী ৬ জানুয়ারি থেকে শোমবার্গ কোরানটি জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
সব বিতর্ক, কটাক্ষ ও রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করেই শেষ পর্যন্ত কোরান শরিফেই শপথ নেন মামদানি। তাঁর এই শপথগ্রহণ শুধু নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সূচনা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ এবং অভিবাসী সমাজের রাজনৈতিক স্বীকৃতির এক শক্তিশালী ঘোষণা।
৩৪ বছর বয়সি ডেমোক্র্যাট নেতা মামদানির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিটিয়া জেমস। এ সময় পবিত্র কোরান হাতে উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী রমা দুয়াজি। উল্লেখযোগ্যভাবে, নিউইয়র্কের গত একশ বছরের ইতিহাসে ৩৪ বছর বয়সে তিনিই কনিষ্ঠতম মেয়র। সূত্র: সনজীবন কুমার ও আজকাল ওয়েবডেস্ক